’কেজিএফ: চ্যাপ্টার ২’-এর ঐতিহাসিক সাফল্যের পর রকিং স্টার যশের বড় পর্দায় প্রত্যাবর্তন মানেই বক্স অফিসে মেগা সুনামি। পরিচালক গীতু মোহনদাসের প্যান-ইন্ডিয়া গ্যাংস্টার অ্যাকশন ড্রামা ‘টক্সিক’ (Toxic: A Fairy Tale for Grown-Ups) নিয়ে দর্শক ও ফ্যানদের মধ্যে যে পর্বতপ্রমাণ প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা বলা বাহুল্য। প্রেক্ষাগৃহে আসার পর সিনেমাটি ভক্তদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরি করলেও, চলচ্চিত্র সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া কিন্তু বেশ মিশ্র, এমনকি বড় অংশেই হতাশার সুর।
প্রথম অর্ধে আশার আলো কিন্তু দ্বিতীয় অর্ধে চরম ছন্দপতন
‘টক্সিক’ কোনো প্রচলিত বাণিজ্যধারার অ্যাকশন ছবি নয়—সিনেমা শুরু হতেই তা স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায়। পরিচালক গীতু মোহনদাস দর্শককে এমন এক অন্ধকার এবং রহস্যময় জগতের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যা সাধারণ কমার্শিয়াল সিনেমার চেনা ছকের বাইরে।প্রথম ২০ মিনিট এবং বিরতির ঠিক আগের দৃশ্যটি (Interval Block) এই সিনেমার অন্যতম সেরা প্রাপ্তি। ড্রামা, গ্ল্যামার, সংঘাত এবং ভয়ংকর অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর মেলবন্ধন ঘটানো হয়েছে দুর্দান্তভাবে। প্রথম অর্ধে যে আবেগের ভিত্তি বা ‘ইমোশনাল কোশেন্ট’ তৈরি করা হয়েছিল, তা দর্শককে গল্পের গভীরে সহজে টেনে নিয়ে যায়।
প্রথম অর্ধ যেখানে দর্শকদের মনে বড় কিছুর আশা জাগায়, ঠিক সেখানেই দ্বিতীয় অর্ধে এসে সিনেমার গ্রাফ দ্রুত নিচের দিকে নামতে থাকে। বিরতির পর গল্পের গতি থমকে যায় এবং দুর্বল লেখনীর কারণে চিত্রনাট্য তার মূল বাঁধন হারিয়ে ফেলে।গল্পকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর বদলে কেবল একের পর এক অ্যাকশন দৃশ্য সাজিয়ে গেছেন পরিচালক। অতিরিক্ত মারামারির ভিড়ে মূল গল্পটি ম্লান হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে বাবা ও ছেলের মুখোমুখি সংঘর্ষের সময় সিনেমাটি সাময়িকভাবে দর্শকদের মনোযোগ ফেরাতে সক্ষম হলেও, ছেলের চরিত্রের আসল সত্য উন্মোচিত হওয়ার পর সাধারণ দর্শকমনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হতে পারে।
চিত্রনাট্যে মৌলিক কোনো টুইস্ট বা গভীরতা না থাকায় মাঝপথে ছবিটি বেশ একঘেয়ে লাগে। তবে শেষদিকে বাবা ও ছেলের মুখোমুখি সংঘাতের দৃশ্যটি আবার নতুন করে দর্শকদের মনোযোগ কাড়তে সমর্থ হয়।
তারকাদের পারফর্ম্যান্স:
- যশের একচ্ছত্র আধিপত্য: পুরো সিনেমাটি প্রায় একা কাঁধে টেনে নিয়ে গেছেন যশ। তাঁর অতুলনীয় স্ক্রিন প্রেজেন্স, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, ইনটেনসিটি এবং রকিং সোয়াগ পর্দায় রীতিমতো আগুন জ্বালিয়েছে। চিত্রনাট্য দুর্বল হলেও যশ নিজের অভিনয়ে বিন্দুমাত্র খামতি রাখেননি এবং প্রমাণ করেছেন কেন তিনি বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা প্যান-ইন্ডিয়া সুপারস্টার।
ছবিতে অনান্য তারকাদের উপস্থিতি ও কাজের বিবরণ:
- কিয়ারা আদবানি: আবেগঘন দৃশ্যগুলোতে তাঁর অভিনয় দুর্দান্ত এবং অত্যন্ত সাবলীল।
- নয়নতারা: যশের সাথে বোনের বন্ধন এবং ফ্ল্যাশব্যাকে তাঁর পারফর্ম্যান্স এক কথায় অনবদ্য। তাঁদের সম্পর্কের এই জায়গাটিই দর্শককে পর্দায় আটকে রাখে।
- হুমা কুরেশি: নেতিবাচক ও ধূসর ভাবমূর্তিতে তিনি বেশ ভালো কাজ করলেও তাঁর চরিত্রের সম্ভাবনা আরও বেশি ছিল।
- তারা সুতারিয়া: স্ক্রিন টাইম বেশ কম হলেও যতটুকু সুযোগ পেয়েছেন নিজের সেরাটা দিয়েছেন।
- রুক্মিণী বসন্ত: একজন অত্যন্ত গুণী ও দক্ষ অভিনেত্রী হওয়া সত্ত্বেও এই সিনেমায় তাঁর চরিত্রটি বলতে গেলে একদমই নষ্ট বা অপচয় করা হয়েছে।
কারিগরি দিক ও মিউজিক:
অ্যাকশনের সাথে বিজিএম-এর মারাত্মক জুগলবন্দি ও টেকনিক্যাল দিক থেকে ‘টক্সিক’ একটি ভিজ্যুয়াল স্পেকটেকল। প্রতিটি অ্যাকশন কোরিওগ্রাফি যেমন হিংস্র, তেমনই দৃশ্যগতভাবে অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। ছবির ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর (BGM) এতটাই পাওয়ারফুল ও ইলেকট্রিক যে ফাইট সিনগুলোকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। অ্যালবামের গানের মধ্যে ‘তবাহি’ (Tabaahi) গানটি আলাদা করে নজর কাড়ে এবং থিয়েটারে বাড়তি উদ্দীপনা তৈরি করে।
ট্রেড অ্যানালিস্টদের রেটিং ও মতামত:
বিখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক ও ট্রেড বিশেষজ্ঞ তরণ আদর্শ (Taran Adarsh) সিনেমাটিকে মাত্র ২ স্টার দিয়ে ‘DISAPPOINTING’ বা হতাশাজনক আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এটি একটি “Body Beautiful minus Soul” টাইপ সিনেমা—অর্থাৎ বাইরে থেকে দেখতে চকচকে ও আকর্ষণীয় হলেও ভেতরের গল্প বা আত্মায় কোনো প্রাণ নেই। যশ আরও অনেক ভালো চিত্রনাট্যের দাবিদার ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার আলোচিত সমালোচক কামাল আর খান (KRK) সিনেমাটিকে সরাসরি ০ স্টার দিয়ে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর দাবি, ৫০০ বার দেখলেও এই সিনেমার গল্প বোঝা অসম্ভব এবং এটি তাঁর দেখা অন্যতম জটিল ও দুর্বল সিনেমা।
বক্স অফিস সাফল্য নাকি ক্ষণিকের ফ্যান ফ্রেঞ্জি?
যশের কাল্ট স্টারডম এবং ভক্তদের বাঁধভাঙা উদ্দীপনার কারণে প্রথম দিনে বক্স অফিসে টাকার পাহাড় গড়েছে ‘টক্সিক’। কিন্তু তরণ আদর্শের রিভিউ অনুযায়ী, প্রাথমিক কৌতূহল এবং ওপেনিং উইকএন্ডের ফ্যান ফ্রেঞ্জি কেটে যাওয়ার পর সিনেমাটি কতটা ব্যবসা ধরে রাখতে পারবে, তা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন থেকেই যায়। স্টাইল আর স্টপ-টু-স্টপ অ্যাকশন দিয়ে হয়তো শুরুতে হল ভরানো যায়, কিন্তু দীর্ঘদিন প্রেক্ষাগৃহ চালানোর জন্য শক্ত গল্পের কোনো বিকল্প নেই।
যশের একক ক্যারিশমা নাকি শক্ত চিত্রনাট্য—প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখার জন্য আপনার কাছে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
একটি প্যান-ইন্ডিয়া অ্যাকশন সিনেমায় শুধুই স্টাইল আর বিজিএম থাকলে কি চিত্রনাট্যের এই বড় ঘাটতি ঢেকে দেওয়া সম্ভব? নাকি ‘কেজিএফ’-এর বিরাট সাফল্যের পর যশের থেকে আরও পরিপক্ক ও প্রাণবন্ত কোনো গল্প আশা করেছিলেন? আপনার নিজস্ব মতামত নিচে কমেন্ট করে অবশ্যই জানান!
