
শান্ত হিমালয়ের কোলে আচমকা নেমে এলো কালান্তক বিপর্যয়। নেপালের উত্তরাঞ্চলে তিব্বত (চীন) সীমান্তসংলগ্ন রসুয়া (Rasuwa) জেলায় এক ছাতি-ফাটা হড়পা বানে (Flash Flood) লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে একের পর এক জনপদ। দেখতে দেখতে জলের তোড়ে ভেসে গেছে শত শত ঘরবাড়ি, সেতু, গাড়ি এবং একাধিক মেগা জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে নেপাল ও চীনের সংযোগকারী ঐতিহাসিক ‘মিতেরী সেতু’ (Friendship Bridge)।
সর্বশেষ পাওয়া সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগে ইতিমধ্যেই অন্তত ১৬০ জনের করুণ মৃত্যু হয়েছে। এখনও পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছেন অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিক। পরিস্থিতি এতটাই সংকটজনক যে নেপাল সরকারের পাশাপাশি ভারতেও ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
প্রলয়ের নেপথ্যে কারণ: তিব্বতের হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ
হঠাৎ করে ভোতে কোশী (Bhote Koshi) এবং লেন্দে (Lende) নদীতে কীভাবে নামল এই জলচ্ছ্বাস?
পরিবেশবিদ ও ভূতাত্ত্বিকদের মতে, এই প্রলয়ের মূল উৎস নেপাল সীমান্তের ওপারে তিব্বতের হিমালয় অঞ্চলে।
- তাপমাত্রা বৃদ্ধি: গত কিছু দিন ধরে তিব্বতীয় হিমালয় অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
- হিমবাহ হ্রদ ফেটে যাওয়া: এর ফলে হিমবাহের ওপরে থাকা বিশালাকার সুপ্রাগ্লেসিয়াল লেক (Supraglacial Lake) বা বরফগলা জলের হ্রদ হঠাৎ ফেটে যায়।
- উত্তাল নদী: হ্রদের কোটি কোটি লিটার জল এক লহমায় প্লাবিত করে ভোতে কোশী ও লেন্দে নদীকে। সংকীর্ণ পাহাড়ি খাত বেয়ে সেই জল তীব্র বেগে নেমে আসে নেপালের নিম্নাঞ্চলে।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত রসুয়া ও ধাদিং: ভেসে গেল মতেরী সেতু
জলচ্ছ্বাসের গতি এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে স্থানীয় বাসিন্দারা সতর্ক হওয়ার সময়টুকুও পাননি। সীমান্তসংলগ্ন রসুয়াগারী (Rasuwagadhi), সিয়াপ্রু বেশি (Syabrubesi) এবং তিমুরে (Timure) এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এ ছাড়া প্রতিবেশী ধাদিং (Dhading) জেলাতেও বন্যার প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে।
মিতেরী সেতুর পতন: নেপাল ও চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রধান মাধ্যম বিখ্যাত ‘মিতেরী সেতু’ (Friendship Bridge) তাশের ঘরের মতো ভেঙে জলের তোড়ে ভেসে গেছে।
নদীর দু’পাশে থাকা বহু বহুতল ভবন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সাইট এবং বহু যানবাহন মুহূর্তের মধ্যে জলের তলে তলিয়ে গেছে।
ধ্বসে গেছে পাহাড়ি রাস্তাঘাট, যার ফলে রসুয়া জেলার বিস্তীর্ণ অংশ এখন দেশ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন।
নিখোঁজ ১৩৩ ভারতীয়:
উদ্ধারকারীদের প্রাথমিক তথ্য বলছে, রসুয়াগারী এলাকায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নির্মাণকাজে প্রচুর ভারতীয় শ্রমিক কর্মরত ছিলেন। এ ছাড়া সীমান্ত এলাকায় ব্যবসায়িক কাজে গিয়ে বহু ভারতীয় নাগরিক আটকে পড়েছেন।
এখনও পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ১৩৩ জন ভারতীয় নাগরিকের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস নেপাল কর্তৃপক্ষের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। নিখোঁজদের সন্ধানে একটি বিশেষ হেল্পলাইন ও কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ:
ময়দানে সেনাবাহিনীর ১২টি হেলিকপ্টার: বিপর্যয়ের পরপরই নেপালের সেনাবাহিনী, সশস্ত্র পুলিশ বল (Armed Police Force) এবং নেপাল পুলিশ যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে, রাতভর যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালানো হচ্ছে। দুর্গত এলাকাগুলোতে মানুষকে উদ্ধারের জন্য নেপাল সেনাবাহিনীর ১২টি বিশেষ হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পাহাড়ি ঢালে এবং নদীর পাড়ে আটকে থাকা মানুষকে আকাশপথে তুলে এনে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে। তবে বৈরী আবহাওয়া ও কাদার ধসের কারণে উদ্ধারকাজে বারবার বাধা আসছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, সময় যত গড়াচ্ছে, মৃতের সংখ্যা আরও অনেকটাই বৃদ্ধি পেতে পারে।
পাশে দাঁড়াল ভারত: ত্রাণ পাঠাল বায়ুসেনার বিমান, বিহার-ইউপি-তে অ্যালার্ট
নেপালের এই চরম মানবিক বিপর্যয়ে দ্রুত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত সরকার। ভারতীয় বায়ুসেনার (IAF) সি-১৩০জে (C-130J) বিশেষ ট্রানস্পোর্ট বিমানে করে ১০ টন মানবিক ত্রাণ সামগ্রী ইতিমধ্যেই নেপালে পৌঁছানো হয়েছে। এতে রয়েছে জরুরি ওষুধ, তাঁবু, শুকনো খাবার এবং জল বিশুদ্ধকরণ কিট।
অন্যদিকে, নেপালের নদীর জল হু-হু করে নিচে নেমে আসায় ভারতেও বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে অ্যালার্ট:
গণ্ডক, কোশী এবং বাগমতী নদীতে জলস্তর দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় উত্তরপ্রদেশ ও বিহারের সীমান্ত এলাকাগুলোতে চরম সতর্কতা (High Alert) জারি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের উদ্বেগ:
শিলিগুড়ি এবং উত্তরবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে পাহাড়ি নদীর গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অশনি সংকেত:
হিমালয় অঞ্চলে এই ধরণের হঠাৎ প্লাবন বা ‘গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড’ (GLOF) ইদানীং বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের প্রভাবে বরফ গলনের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়াই যে এই ধরণের বিপর্যয়ের অন্যতম মূল কারণ, তা পরিবেশবিদরা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। রসুয়ার এই ঘটনা বিশ্ববাসীর কাছে প্রকৃতির আরও একটি বড় সতর্কবার্তা।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ এবং পাহাড়ি অঞ্চলে একের পর এক বিপর্যয় নিয়ে আপনার মতামত কী? পরিবেশ রক্ষায় এখনই আমাদের কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন? নিচে কমেন্ট করে জানান।
